Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The company has transitioned to a content production studio, offering creative solutions for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Roar Media website, click here.

প্রাচীন পৃথিবীতে রুপচর্চার অদ্ভুত যত পদ্ধতি

রুপচর্চার জন্য মানুষ যে কত কিছু করে তা আমাদের চারপাশে আমরা প্রতিনিয়তই দেখতে পাই। বিশেষ করে দৈনিক পত্রিকার নানা লেখা পড়ে কিংবা টিভি চ্যানেলগুলোতে এ সংক্রান্ত নানা অনুষ্ঠান দেখে আমাদের অনেকের মনে একটা প্রশ্নই কেবল ঘোরাফেরা করে- “এইগুলা মানুষ করে ক্যান?” মজার ব্যাপার হলো, আজ রুপচর্চার নানা পদ্ধতি দেখে আমাদের যাদের চোখ কপালে উঠছে, সেই আমরাই যদি অতীতের কিছু রুপচর্চার পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারি, তাহলে চোখ বোধহয় কোটর থেকেই বেরিয়ে আসবে!

কেন বললাম এমন কথা? উত্তরটুকু নাহয় নিচের পুরো লেখা জুড়েই খুঁজতে থাকুন।

মধ্যযুগের বড় কপাল

বিভিন্ন চিত্রকর্মে মধ্যযুগের মহিলাদের যেসব ছবি আমরা দেখি, তার সাথে আমাদের বর্তমান সমাজের মেয়েদের সাজসজ্জার বেশ বড় একটা পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতপক্ষে তখনকার সময়ে নিজের কপালকে স্বাভাবিকের চেয়ে আরো বড় এবং কিছুটা বাঁকানো রুপে দেখানোই ছিলো সৌন্দর্যের পরিচায়ক। সেজন্য তাদের অনেকেই সামনের দিকের কিছু চুল কাটা কিংবা তুলে ফেলার মতো কাজটি করতো।

রঙ করা পা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাইলনের সংকট দেখা দেয়ায় বাজারে প্যান্টিহসের যোগানও কমে যায়। কিন্তু সেটি পরলে পায়ে আসা তামাটে বর্ণের সৌন্দর্যের কথা ভুলতে পারে নি অনেকেই। এজন্য তখন বাজারে আসে ডজনখানেক রঙ যেগুলো পায়ে লাগালে দূর থেকে অনেকটা নাইলনের মতোই মনে হতো। LIFE ম্যাগাজিনের ১৯৪২ সালের এক সংখ্যাতেও এ সম্পর্কে বলা হয় যে, এভাবে রঙ করা পাগুলো আসল প্যান্টিহসের চেয়ে আলাদা করা ছিলো আসলেই দুঃসাধ্য।

চীনা নারীদের পদ্মের মতো পা

এখন যে প্রথাটির কথা বলতে যাচ্ছি তা আমাদের সবার চোখেই বেশ অমানবিক ঠেকবে। তবে এমন অমানবিক প্রথাই এককালে চীনে ছিলো বেশ জনপ্রিয়।

ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে এককালে চীনের অনেক নারীকেই তাদের পা যতটা শক্ত করে সম্ভব বাঁধতে উৎসাহিত করা হতো। এর লক্ষ্য ছিলো পায়ের পাতা যাতে কোনোভাবেই ৪ ইঞ্চির বেশি বড় না হয়! আর উদ্ভট এ প্রক্রিয়ার ফলে দুমড়ানো-মোচড়ানো যে পা পাওয়া যেত, তাকে তারা বলতো ‘পদ্মের মতো পা’!

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, প্রাচীন চীনা সমাজ ব্যাবস্থায় বিকৃত এ পা-ই ছিলো পুরুষদের কাছে সর্বাপেক্ষা যৌনাবেদনময় অঙ্গ। স্ত্রীর সাথে মিলিত হবার আগে তারা অনেকক্ষণ ধরে কেবল তার সেই পায়েই হাত বুলিয়ে আদর করতো। কিং রাজবংশের সময়কালে একটি নির্দেশিকাও প্রকাশ করা হয়েছিলো এ বিষয়টি নিয়ে। সেখানে নারীদের পদ্ম পায়ে আদর করার ৪৮টি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিলো!

নারী শরীরের সেই বিকৃত পা-কে যদি শুধু যৌনাবেদনময় অঙ্গ বলা হয়, তাহলে ভুল বলা হবে, বরং এর আগে ‘সবচেয়ে’ শব্দটিও যোগ করতে হবে। কারণ প্রাচীন চীনের যৌনতা বিষয়ক নানা বইয়ে নারীদের এমন ছবি দেখা গেছে যেখানে তারা সারা শরীর উন্মুক্ত রাখলেও ঢেকে রেখেছে তার সেই ‘পদ্মের মতো পা’। পায়ের বাঁধনগুলো নিয়ে তাদের এমনভাবে খেলা করতে দেখা যেতো যে, এখনই যেন তারা পাগুলো সবার সামনে দেখাতে যাচ্ছে, তবুও দেখাচ্ছে না!

মাথার খুলির স্বাভাবিক আকৃতির পরিবর্তন

খুলির স্বাভাবিক আকৃতি পরিবর্তনের এ চর্চার প্রমাণ মেলে খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দের দিকে মায়া সভ্যতার লোকদের মাঝে। একেবারে শৈশব থেকে শুরু হতো এ প্রক্রিয়া। এজন্য একটি শিশুকে কোনো বোর্ডের সাথে বিভিন্ন হাতিয়ার সহযোগে শক্ত করে বেঁধে রাখতো। মাথার দিকে এমনভাবে চাপ দিয়ে রাখা হতো যেন তা কিছুটা লম্বাটে আকার ধারণ করে।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকেই যেতে হতো এ প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে। এটি তাদের সামাজিক মর্যাদার সাথে সম্পর্কিত ছিলো না। বরং তারা এটাকে সৌন্দর্য চর্চার অংশ হিসেবেই দেখতো। হান, হাওয়াইয়ের অধিবাসী, তাহিতির অধিবাসী, ইনকা সভ্যতা, উত্তর আমেরিকার চিনুক ও চকতাও গোত্রের লোকেদের মাঝেও এ চর্চা প্রচলিত ছিলো।

বড় নখ যখন প্রাচুর্যের প্রতীক

এবারের ঘটনার কেন্দ্রেও থাকছে চীনের অধিবাসীরা। এককালে চীনের লোকদের মাঝে হাতের নখ বড় রাখার চল ছিলো। কিং রাজবংশের সময়কালে তাদের নারী-পুরুষদের হাতের নখ কখনো কখনো ৮-১০ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা দেখা যেত। কোনো কোনো নারীকে নখ ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে স্বর্ণের তৈরি নেইল-গার্ড ব্যবহার করতেও দেখা গিয়েছে।

নখ বড় রাখার বিচিত্র এ চর্চা দেখা যেত মূলত ধনী সমাজের মাঝেই। তারা এমনটা করতো এটা বোঝাতে যে, তাদের এত টাকা-পয়সা আছে যে নিজ হাতে অনেক কাজ না করলেও তাদের চলে। দাস-দাসী দিয়েই জামা-কাপড় পরা ও খাওয়াদাওয়ার কাজটা সেরে নিতো তারা।

চোখের পাতার লোম উৎপাটন

মধ্যযুগে এবং রেনেসাঁর সময়ে ইউরোপের নারীদের সাজসজ্জা শুধু মাথার চুল তুলে কপাল বড় করার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। চোখের পাতার লোমকে তখন অতিরিক্ত যৌনাবেদনময়তার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। তাই অনেক নারীই তাদের সেই লোমগুলো একেবারে তুলে ফেলতেন।

জাপানী নারীদের কাল দাঁত

প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস আমাদের মাঝে গড়ে ওঠে সেই ছোটবেলা থেকেই। দাঁতের সুরক্ষা রক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দাঁতকে ঝকঝকে সাদা দেখানোও নিয়মিত এ ব্রাশ করার অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে জাপানী নারীদের মাঝে প্রচলিত সৌন্দর্য চেতনা ছিলো এর ঠিক উল্টো। হাজার বছর ধরে জাপানী নারীরা তাদের দাঁতকে কালো রঙে রাঙিয়ে নিতো। উনিশ শতক পর্যন্তও তাদের মাঝে এ চর্চা দেখা গেছে। সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি বিয়ের অঙ্গীকার রক্ষার একটা প্রতীকি রুপও ছিলো কালো এ দাঁত।

বিউটি প্যাচ (Beauty Patch)

আঠারো শতকে এসে ইউরোপীয় নারীদের সৌন্দর্য চর্চায় পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। আগেকার সময়ের হালকা সাজসজ্জার বদলে তখন তারা বেশ ভারী সাজসজ্জার দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। এরই একটা অংশ ছিলো বিভিন্ন ধরনের বিউটি প্যাচ।

চাঁদ, তারা, বর্গ, বৃত্ত ইত্যাদি নানা আকৃতির বিউটি প্যাচ পাওয়া যেত তখন। ছোট ছোট সেই ফেব্রিকগুলো মুখের বিভিন্ন জায়গায় লাগানো হতো। আর একেক জায়গায় লাগানোর অর্থ ছিলো একেক রকম। যেমন- যদি কোনো নারী এমন বিউটি প্যাচ তার ডান গালে পরতো তবে তার অর্থ হতো যে, সে বিবাহিতা।

শিরাময় ক্লিভেজ

এখন যে চর্চাটার কথা বলবো তা যে কিভাবে জনসমক্ষে নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শনের একটা উপায় হতে পারে তা তৎকালীন নারীরাই ভালো বলতে পারবেন।

সতের শতকে ইংল্যান্ডে নারীদের ফ্যাশনের মাঝে অন্যতম জনপ্রিয় ছিলো নিজেদের ক্লিভেজ। এ উদ্দেশ্যে জামার গলা নিচে নামানোর চল শুরু হয় তখন। একই সময়ে নিজেদের চামড়াকে যথাসাধ্য ফ্যাকাশে করে দেখানোর একটি ফ্যাশনও ছিলো। এটা অবশ্য দেখা যেত মূলত ধনী সমাজের নারীদের মাঝে। এটা দ্বারা তারা বোঝাতে চাইতো যে, তাদের এত বেশি টাকা-পয়সা আছে যে, ঘরের বাইরে গিয়ে শ্রমসাধ্য কাজগুলো না করলেও তাদের চলে। মুখ থেকে ক্লিভেজ পর্যন্ত পাউডার মেখে নিজেদের সাদা দেখানোর পাশাপাশি বক্ষদেশে নীল রঙের শিরাও এঁকে নিতেন তারা। তাদের ত্বক যে আলোকভেদ্য এটা বোঝাতেই এমন অদ্ভুত কাজ করতেন তারা।

রঙিন ভ্রু

আবারো প্রাচীনকালের চীন থেকে একটু ঢুঁ মেরে আসা যাক। তৎকালীন নারীরা তাদের ভ্রুকে কালো, নীল কিংবা সবুজ গ্রীজ দিয়ে রাঙাতে খুব পছন্দ করতো। সেই সাথে তখনকার ফ্যাশন অনুযায়ী ভ্রুকে দিতো নানা আকৃতি।

হান রাজবংশের সময়ে কোনো দিকে নির্দেশ করা ভ্রু’র স্টাইল বেশ জনপ্রিয় ছিলো। আবার এককালে ‘দুঃখের ভ্রু’ নামক একপ্রকার স্টাইল বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। এই স্টাইল অনুসারে কারো ভ্রুকে মাঝখানের জায়গায় বাঁকিয়ে কিছুটা উপরের দিকে তুলে দেয়া হতো।

জোড়া লাগা ভ্রু


প্রাচীন গ্রীসে জোড়া লাগা ভ্রু ছিলো নারীদের পবিত্রতা এবং বুদ্ধিমত্তার প্রতীক। এজন্য জন্মগতভাবে এটা না থাকলে অনেকেই চোখে সুরমা ব্যবহার করে সেই ঘাটতিটা পূরণ করতো।

লম্বা গাল

সৌন্দর্যের সংজ্ঞা যে যুগে যুগে পাল্টায় এতক্ষণ ধরে উপরের লেখাগুলো পড়ে তো সেগুলো বুঝে যাওয়ার কথা যে কারোরই। এখন এ তালিকায় আরেকটি তথ্য যোগ করা যাক। আজকের দিনে সবাই যেখানে ‘স্লিম ফিগার’-এর দিকে ঝুঁকছে, সেখানে চীনে ট্যাং রাজবংশের শাসনামলে ব্যাপারটা ছিলো ঠিক উল্টো। তখন স্থূলকায়, গোলগাল মুখ, লম্বা গাল এবং প্রশস্ত কপালের মেয়েদেরই সুন্দর বলে বিবেচনা করা হতো।

মূত্র দিয়ে দাঁত পরিষ্কার

প্রাচীন ধনী রোমান সম্প্রদায়, আরো ভালো করে বলতে গেলে ধনী রোমান নারীরা তাদের দাঁতকে ঝকঝকে সাদা করার জন্য বেছে নিয়েছিলো মানবমূত্রকে। সেই মূত্র দিয়ে ধুয়েই দাঁত পরিষ্কারের কাজটি সারতো তারা। তবে যেনতেন মানুষের মূত্রের উপর ভরসা করতে পারতো না তারা। দাঁত পরিষ্কারের জন্য তারা শুধুমাত্র পর্তুগিজদের মূত্রই ব্যবহার করতো। এজন্য জাহাজ ভর্তি করে জার পূর্ণ পর্তুগিজ মূত্র আসতো রোমান নারীদের জন্য। মূত্রে থাকা অ্যামোনিয়া জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করতো। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও সত্য যে, আঠার শতক পর্যন্ত মাউথওয়াশ হিসেবে মূত্র ব্যবহৃত হয়েছে।

রক্ত ঝরানো

মধ্যযুগে ইউরোপে চেহারার মাঝে কিছুটা ফ্যাকাশে ভাব থাকার অর্থ ছিলো যে, আপনি ধনী। বাইরে কাজ করতে গেলে রোদে পুড়ে দেহ কিছুটা তামাটে বর্ণ ধারণ করে। এজন্য নিজেদের চেহারাকে যথাসম্ভব ফ্যাকাশে দেখানোও এককালে ইউরোপের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিলো।

এখন প্রশ্ন হলো- মুখকে কিভাবে ফ্যাকাশে দেখানো যায়? এজন্য বিভিন্ন রকম পন্থাই অবলম্বন করা হতো। এর মাঝে ৬ষ্ঠ শতকে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলো একটি পদ্ধতি। এজন্য একজন নারী তার শরীরে জোঁক লাগিয়ে রাখতেন। জোঁক রক্ত শুষে নেয়ায় স্বাভাবিকভাবে রক্তশূন্যতার দরুণ কিছুটা ফ্যাকাশে লাগতো সেই নারীকে। ব্যাস, এতেই হয়ে যেত তাদের ফ্যাশন!

তথ্যসূত্র

১) ranker.com/list/crazy-womens-beauty-standards-from-history/machk

২) bustle.com/articles/119455-7-weirdest-beauty-trends-methods-throughout-history

৩) bust.com/style/15479-tk-totally-weird-beauty-trends-in-history.html

৪) stuffmomnevertoldyou.com/blogs/beauty-patches.htm

৫) roarbangla.com/history/bizarre-lifestyle-of-ancient-china/

Related Articles