খেলাধুলা

ক্রিকেটের সত্যিকারের চোকার ইংল্যান্ড!

Published

Search Icon Search Icon Search Icon Search Icon

চোকার শব্দটি দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দলের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে। সাধারণভাবে প্রচলিত না থাকলেও শব্দটি কিন্তু ইংল্যান্ডের জন্যে সমানভাবে খাটে। কীভাবে খাটে তা জানার আগে চলুন চোকার শব্দটি ও এর সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্ক দেখে আসি।

আভিধানিক ভাষায় Choke অর্থ হলো শ্বাসরুদ্ধ হওয়া বা শ্বাসরোধ করা। তবে চোকার বলা হয় এক ধরনের হারকে, যেটা গলার চারপাশে ভালোভাবে এঁটে যায়। কিন্তু খেলাধূলার জগতে শব্দটির মানে ভিন্ন। দারুণ অনুকূল অবস্থা থেকে খেলায় হেরে গেলে দেওয়া হয় এই উপাধি। তবে ইদানিং শব্দটির বাড়াবাড়ি রকমের ব্যবহার বেশ লক্ষ্যণীয়। কোনো ম্যাচে অভাবনীয়ভাবে হেরে গেলেই পরাজিত দলকে চোকার বলে ফেলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সিয়ান বেইলক চোকিং নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি ও টম কার মনে করেন, চাপের কারণে আত্ম-সচেতনতা ও উদ্বেগ বেড়ে যায়। এর ফলে খেলোয়ার পারফরম্যান্সের ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে সঠিকভাবে পারফর্ম করতে না পেরে চোকিং এর শিকার হন। একে বলা হয় এক্সপ্লিসিট মনিটরিং থিওরি। তবে চোকিং এর কারণ নিয়ে আরও অন্তত ৬ টি ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব আছে।

চোকার শব্দটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত হকি, ক্রিকেট, আমেরিকান ফুটবল ও বেসবল খেলায়। তবে শব্দটির সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রয়োগ ঘটেছে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দলের ক্ষেত্রে। সকল ফরম্যাটের ক্রিকেটে সব সময় র‍্যাংকিং এ উপরের দিকে থাকা সত্ত্বেও দলটি বিশ্বকাপে বাজে পারফর্ম করে ফেলে। বর্তমানে (ডিসেম্বর, ’১৬) এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ, টি টুয়েন্টি ও টেস্ট ম্যাচে তাদের র‍্যাংক যথাক্রমে ২, ৩ ও ৪।  মাঝেমাঝেই তারা চলে আসে এক নম্বরে। অথচ ২০১৫ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত দলটি কোনো বিশ্বকাপেই নক আউট ম্যাচে জয়লাভ করতে পারেনি। গত (২০১৫) বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে অন্তত একটি দুর্নাম (নক আউট ম্যাচের চিরাচরিত পরাজয়) ঘুচাতে সক্ষম হয় তারা। চোকার উপাধি পাবার পেছনের ঘটনাগুলো দেখে আসা যাক এক নজরে।

১৯৯২ সালের সেমিফাইনাল। প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। কিন্তু খেলায় বাধা দিল বৃষ্টি। হাজির ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতি। দক্ষিণ আফ্রিকার টার্গেট দাঁড়াল ১ বলে ২২ রান! এভাবেই শুরু চোকিং-এর ইতিহাস।

‘৯৬ বিশ্বকাপে বাদ পড়তে হল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই। এবার প্রতিপক্ষ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে সুপার সিক্স ধাপের ম্যাচ। অসি সেঞ্চুরিয়ান স্টিভ ওয়াহর গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ ছেড়ে দেন হার্শেল গিবস। এ সময় নাকি স্টিভ ওয়াহ বলেছিলেন, ‘তুমি তো এই মাত্র বিশ্বকাপটাই ফেলে দিলে।‘ অবশ্য কথাটির সত্যতা অনিশ্চিত। পরে সেমিফাইনাল স্টেজেও অস্ট্রেলিয়ার সাথে ম্যাচ। এবার টাই হল। কিন্তু রান রেটের হিসাবে হেরে গিয়ে শেষ হয়ে যায় তাদের বিশ্বকাপ মিশন।

চিত্রঃ হার্শেল গিবসের ক্যাচ ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা

চিত্রঃ হার্শেল গিবসের ক্যাচ ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা

২০০৩ সাল। এবার বিশ্বকাপ নিজেদের দেশেই। নক আউট ম্যাচে দেখা শ্রীলঙ্কার সাথে। হানা দিল বৃষ্টি। আবারও ডাকওয়ার্থ লুইস মেথড। এবং আবারো বিদায়!

পরের বিশ্বকাপ ২০০৭ সালে।  ক্যারিবিয়ানের দেশে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার কাছে আবারও সেমিফাইনালে হার। ২০১১ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে হার নিউজিল্যান্ডের সাথে। ফলে নক আউট ম্যাচে হারের রেকর্ড এবারও অক্ষুণ্ণ থাকল। ২০১৫ সালে নক আউট ম্যাচে হারের দুর্নাম থেকে বেরিয়ে আসা গেল। তবে সেমিফাইনালে ঠিকই হারতে হল। এবারের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।

কিন্তু উপাধি না পেলেও ইংল্যান্ডও বা চোকিং-এ কম যায় না। বরং খানিকটা বেশিই বটে। তা কীভাবে? চলুন, জানা যাক। র‍্যাঙ্কিং এ দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে একটু পিছিয়ে থাকলেও ইংল্যান্ডের র‍্যাংক মোটামুটি ৬ এর মধ্যেই থাকে। বর্তমানে (ডিসেম্বর, ’১৬) তারা তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই ৫ নম্বরে অবস্থান করছে। তাছাড়া ক্রিকেটের জনক বলে কথা। এবারে দেখা যাক, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের পারফরমেন্স।

শুধু বিশ্বকাপ বিবেচনা না করে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পরিসংখ্যানে একটু চোখ বুলানো যাক।  দুটো টুর্নামেন্ট মিলিয়ে ইংল্যান্ড মোট ৫ বার  ফাইনালে পৌঁচেছে- ১৯৭৯, ১৯৮৭ ও ১৯৯২ এর ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং ২০০৪ ও ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি । আর প্রত্যেক বারই হার!

১৯৭৯ সাল। ’৭৫ এর পর ২য় বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ওডিআই বিশ্বকাপ। ফাইনালে ইংল্যান্ডের দেখা হলো আগের টুর্নামেন্টের শিরোপাধারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ আগে ব্যাটিং করে তুলল ২৬৭ রান। একটা পর্যায়ে ইংল্যান্ডের রান ছিল ২ উইকেটে ১৮৩। কেউ কি ভেবেছিল ১৯৪ রানের মধ্যে গুটিয়ে যেতে পারে ইংল্যান্ডের ইনিংস? এই ধসের নায়ক ছিলেন ৩৮ রানে ৫ উইকেট নেওয়া উইন্ডিজ বোলার জোয়েল গারনার।

১৯৮৭ র ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল। প্রতিপক্ষ এবার অস্ট্রেলিয়া। আগে ব্যাট করে অসিরা তুলল ২৫৩। জবাবে এক পর্যায়ে ইংলিশদের সংগ্রহ ২ উইকেটে ১৩৫। কিন্তু, এর পর একের পর এক ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা খেই হারিয়ে দলের শ্বাসরোধ করে দিলেন। ফলাফল, অস্ট্রেলিয়ার ৭ রানের জয়।

চিত্রঃ ‘৮৭’র বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের পরাজয়

চিত্রঃ ‘৮৭’র বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের পরাজয়

এল ৯২র বিশ্বকাপ। এবারও  শ্বাসরোধ হলো ইংলিশদের। তারকায় ঠাসা পাকিস্তান আগে ব্যাটিং করে জমা করল ২৪৯ রান। ২২ রানের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল সত্যিকারের চোকার ইংল্যান্ড। এভাবেই সব মিলিয়ে তিন বার তারা বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছতে পেরেও শিরোপার মুখ দেখতে ব্যর্থ।

এরপর থেকে আর কোনোবার বিশ্বকাপ ফাইনালের মুখই দেখেনি ইংল্যান্ড। অবশ্য তারা দুইবার মিনি বিশ্বকাপ নামে পরিচিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে উঠেছিল । একবার নিজের দেশে ২০০৩ সালে এবং আবার ২০১৩ সালে। ২০০৩ এর ফাইনালে তারা ২১৭ রানের মোটামুটি স্কোর দাঁড় করালেও এক পর্যায়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৪৭/৮ স্কোরের টর্নেডোর মধ্যে ফেলে দেয়।  তখন মনে হচ্ছিল এবার ট্রফির খরা ঘুচবে ক্রিকেটের জনকদের। কিন্তু দুই উইন্ডিজ ব্যাটসম্যান কোর্টনি ব্রাউনি ও ব্র্যাডশো এর ৭১ রানের নবম উইকেট জুটি ইংলিশদের আবারো চোকিং করিয়ে ছাড়ল।

২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনাল। খেলা নিজেদের দেশেই। বার্মিংহামের এজবাস্টনে অনুষ্ঠিত বৃষ্টি-বিঘ্নিত ২০ ওভারের ম্যাচে ভারত আগে ব্যাট করে তুলল মাত্র ১২৯ রানের মামুলি স্কোর। সহজ এই টার্গেটে শেষ ১৫ বলে জিততে দরকার ছিল ২০ রান। তখনও হাতে আছে ৬ টি উইকেট। ক্রিজে আছে ইয়ন মরগান ও রবি বোপারা। পরপর দুই বলে এই দুজন সাজঘরে চলে গেলেন। শেষ পর্যন্ত অল আউট না হলেও টার্গেটে পৌঁছার আগেই ফুরিয়ে যায় বল। ৫ রানের পরাজয় অবধারিত হয়ে গেল এভাবেই।

চিত্রঃ ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রপির ফাইনালে হার।

চিত্রঃ ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রপির ফাইনালে হার।

২০১৫ বিশ্বকাপেও তারা উজ্জীবিত বাংলাদেশের কাছে হেরে বিদায় নেয় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, চোকিং-এর দিক দিয়ে ইংল্যান্ডও কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। আমরা ইংল্যান্ডকে সহজেই ক্রিকেটের ২য় চোকার বলতে পারি। চাইলে প্রথমও বলতে পারি। কারণ, তারা পাঁচ পাঁচটি ফাইনাল থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরেছে।

তথ্যসূত্র

১। https://en.wikipedia.org/wiki/Choke_(sports)
২। https://www.theguardian.com/sport/2011/jun/14/the-spin-cricket-email
৩। http://www.espncricinfo.com/icc-champions-trophy-2013/engine/current/match/566948.html
৪। http://www.cricbuzz.com/cricket-stats/icc-rankings

 

এই লেখা নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?

Fascinated
Informed
Happy
Sad
Angry
Amused

মন্তব্যসমূহ