বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বাহন রিক্সার যত কথা

Ahmed Estiak Bidhan

Contributor

রিক্সা! ত্রিচক্রের এক রঙ বেরঙের যান। ব্যস্ত নাগরিক জীবনের এক অপরিহার্য বাহন। রিক্সা ছাড়া নাগরিক জীবনের কথা যেনো বাংলাদেশে কল্পনাও করা যায় না। নিম্নবিত্ত বহু মানুষের ঘামে ভেজা ভরসার স্থল এ রিক্সা। হয়তবা আয়ের একমাত্র উৎস। মধ্যবিত্তদের সাধ ও সাধ্যের এক অপূর্ব সমন্বয়।

86794_1
Source: timenewsbd.com

রিক্সা বাংলাদেশের এক জনপ্রিয় বাহন। শহুরে জীবনের রাস্তা-ঘাটের অধিকাংশই এর দখলে থাকে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা কিন্তু “রিকশা রাজধানী” হিসেবেও বেশ পরিচিত! রিকশার ইতিহাস অনেক পুরোনো এক ইতিহাস। বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর ক্লান্ত চলাচল চোখে পড়ে। চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, মালোয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই এর মন্থর চাকা অবিরাম ঘুরতে দেখা যায়।

বাংলা রিক্সা শব্দটি এসেছে জাপানী জিনরিকশা শব্দটি থেকে। চীনা ভাষায় জিন শব্দের অর্থ করলে দাঁড়ায় মানুষ, রিকি শব্দটির অর্থ হল শক্তি আর শা শব্দটির মানে বাহন। শব্দগুলোকে যদি আমরা একে একে যোগ করি তাহলে পাই মানুষের শক্তিতে চলা বাহন।

traditional_japan_costumes_002
Source: world4.eu

দেশ ভেদে রিক্সার আকার, গঠন প্রকৃতি বিভিন্ন হয়। আবার বিভিন্ন দেশে একে বিভিন্ন নামেও ডাকা হয়ে থাকে। চীনে সানলুঞ্চে, কম্বোডিয়ায় সীক্লো, মালোয়েশিয়ায় বেকা, ফ্রান্সে স্লাইকো নামে রিক্সা পরিচিত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এটি পেডিক্যাব নামেও পরিচিত। সুপ্রাচীনকাল থেকে জাপানেই রিক্সার অস্তিত্ব জানা যায়। সেই রিক্সাগুলো অবশ্য তিন চাকার ছিল না। দুই দিকে ছিল দুই চাকা আর সামনের চাকার বদলে একজন মানুষ রিক্সাটি ঠেলে নিয়ে যেত। এ ধরণের রিক্সাকে বলা হয় “হাতেটানা রিক্সা”।

রিক্সার ইতিহাস

রিক্সার উদ্ভব হয় ১৮৬৫ থেক ১৮৬৯ সালের মাঝে। পালকির বিকল্প হিসেবে এর উত্থান। প্রথম কে এই বাহনের প্রচলন করেছিলেন তা নিয়ে নানা জনের নানা মত রয়েছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতটি হলো জোনাথন স্কোবি নামের একজন মার্কিন নাগরিক যিনি মিশনারি হিসেবে কাজ করতেন তিনিই ১৮৬৯ সালে রিক্সা উদ্ভাবন করেন। তিনি থাকতেন জাপানের সিমলায়।

neel_vomora_172514336152a0971319ecf9-55420725_xlarge
Source: somewhereinblog.net

১৯০০ সাল থেকে কলকাতায়ও এর ব্যবহার শুরু হয়। প্রথমদিকে এতে শুধু মালপত্রই আনা নেয়া করা হত। ১৯১৪ সাল থেকে কলকাতা পৌরসভা এতে যাত্রী পরিবহনেরও অনুমতি দেয়। এরই মাঝে বার্মা বা, বর্তমান মিয়ানমারের রেঙ্গুনেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে রিক্সা। ধারণা করা হয় যে, বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৯১৯ বা, ১৯২০ সালের দিকে মায়ানমার হয়েই রিক্সার আগমন ঘটে। তবে ঢাকায় রিক্সা কিন্তু রেঙ্গুন থেকে আসেনি। এসেছিল কলকাতা থেকে,নারায়নগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের পাট ব্যবসায়ীদের কল্যাণে। তারা তাদের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য কলকাতা থেকে ঢাকায় রিক্সা নিয়ে আসেন। কোন কোন সূত্রমতে ঢাকাতে প্রথম রিক্সার লাইসেন্স দেয়া হয় ১৯৪৪ সালের দিকে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় জ্বালানি সংকটের কারণে জাপানে রিক্সার প্রচলন ব্যাপক বেড়ে যায়। যদিও এখন আর জাপানে রিক্সা দেখা যায় না, জাদুঘর ছাড়া।

Source: en.wikipedia.org
জাপানের জাদুঘরে রাখা একটি প্রাচীন আমলের রিক্সা (Source: en.wikipedia.org)

আগেকার মানুষ টানা রিক্সার প্রচলন এখন আর তেমন নেই বললেই চলে। সেই রিক্সাগুলোর দুই পাশে দুইটি লম্বা রড থাকত যা টেনে রিক্সাচালকরা রিক্সাকে টেনে নিয়ে যেতেন। রিক্সাতে মূলত দুইজনের জন্য বসার সিট থাকে। তবে মাঝে মাঝে ৩-৪ জনকেও কায়দা করে উঠতে দেখ যায়। এ প্রবণতা তরুণদের মাঝেই বেশি। বর্তমানের রিক্সাগুলো হয় প্যাডেল চালিত। ফলে রিক্সাচালকদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। বর্তমানে বৈদ্যুতিক যন্ত্রচালিত রিক্সার প্রচলনও অতি দ্রুততার সাথে বাড়ছে। ২০০৫ সালের দিকে ভারতের পচিমবঙ্গ সরকার হাতে টানা রিক্সাকে অমানবিক বলে তা নিষিদ্ধের প্রস্তাব আনেন। বিলটি পাশ হলেও বিলটির বিরুদ্ধে পিটিশন হওয়াই তা এখনও কার্যকর হয়নি। বর্তমানে এই বিলটি সংশোধনের কাজ চলছে। ভারতের অন্যান্য কিছু শহরেও যানজটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রিক্সাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে রিক্সার জনপ্রিয়তার কারণে রাপা প্লাজার কাছে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের শুরুতেই স্থাপিত হয়েছে সম্পূর্ণ শিকল দিয়ে তৈরি একটি রিক্সা, এর চালক এবং এর যাত্রীদের নিয়ে সুন্দর এক ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি মৃণাল হকের তৈরি। ভাস্কর্যটির নাম ইস্পাতের কান্না।

Source: bdtravelnews.com/
মৃণাল হকের ইস্পাতের কান্না ভাস্কর্যটি (Source: bdtravelnews.com/)

রিক্সার সংখ্যা

১৯৮০ সালে সারা বিশ্ব প্রায় ৪০ লাখের মত রিক্সা ছিল। ১৯৪১ সালেও ঢাকায় রিক্সার সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭ টি। ১৯৪৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮১ টিতে। বর্তমানে ঢাকাতেই শুধু ৩ থেকে ৭ লাখ রিক্সা রয়েছে। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুসারে, ঢাকায় কমপক্ষে ৫ লক্ষাধিক রিক্সা চলাচল করে এবং ঢাকার ৪০ শতাংশ মানুষই রিক্সায় চলাচল করে। ২০১৫ সালে এটিকে বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে তাদের বইয়ে স্থান দেয়।

gwr-tm-record-holder-strap-stripes1
Source: chillisauce.co.uk

রিক্সার পেছনের চিত্রশিল্প

আমাদের অনেক রিক্সার পেছনেই এক ধরণের পেইন্টিং বা, চিত্র আঁকানো থাকে। এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। এই রিক্সা চিত্রগুলো আমাদের গর্বের বিষয়। এটিকে আমাদের চিত্রকলার সম্পূর্ণ আলাদা একটি ধারাও বলা চলে। রিক্সাচিত্র বলতে উজ্জ্বল রঙে আঁকা কিছু চিত্রকে বোঝানো হয়। সাধারণত বাংলাদেশ এবং ভারতেই রিক্সার পেছনে এ ধরণের চিত্রকলা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞরা একে ফোক আর্ট, পপ আর্ট বা, ক্র্যাফটের মর্যাদাও দিয়ে থাকেন।

rickshaw_paint
Source: amarblog.com

১৯৫০ এর দশকে বাংলাদেশে রিক্সাচিত্রের প্রচলন শুরু হয়। রিক্সাচিত্রে ফুল-ফল, পশু-পাখি, নদী-নালা, প্রকৃতি এমনকি জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের ছবিও আঁকানো হয়ে থাকে। কখনও কখনও রিক্সাচিত্রে রিক্সাচালকের ধর্মীয় বিশ্বাস বা, সামাজিক কোন বক্তব্য প্রতিফলিত হত। তবে বর্তমানে কম্পিউটারের সাহায্যে ছবি তৈরি করে, টিনের ধাতব প্লেটে ছাপ দিয়ে খুব সহজেই রিক্সাচিত্র তৈরি করা হয়। ফলে দেশের ঐতিহ্য বা, প্রকৃতি আর সেভাবে সেখানে ফুটে ওঠেনা। ফলে রিক্সা চিত্রশিল্পীরা তাদের কর্মক্ষেত্র হারাচ্ছেন, পাশাপাশি এই শিল্পও তাঁর অতীত গৌরব হারাতে বসেছে।

২০১১ সালে বাংলাদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনের সময়ও বাংলাদেশের রিক্সার ঐতিহ্য বেশ ভালভাবে পৃথিবীবাসীর সামনে তুলে ধরা হয়। সেখানে প্রতিটি দলের অধিনায়করা রিক্সায় করে মাঠে উপস্থিত হন। বিষয়টি বেশ প্রশংসিত হয়।

112805104
২০১১ এর বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের রিক্সায় করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রবেশ (Source: gettyimages.com)

রিক্সা একটি পরিবেশ বান্ধব বাহন। কোনরকম বায়ু দূষণ ঘটায় না রিক্সা। এছাড়াও বহু মানুষ রিক্সা চালিয়ে বা, তৈরি ও মেরামত করে তাদের জীবন, জীবিকা চালিয়ে থাকে। এ প্রাচীন বাহনটি বর্তমানে বাংলাদেশের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এর আবেদন কমার বদলে দিনকে দিন মানুষের মাঝে বেড়েই চলেছে। যানবাহনগুলোর মাঝে রিক্সাকে বেশ নিরাপদ হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। সবাই সচেতন হলে হয়ত একদিন রিক্সা চিত্রশিল্পেরও সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তথ্যসূত্রঃ

১। https://bn.wikipedia.org

২। http://anupamcommunity.com/

৩। http://blog.bdnews24.com/

৪। http://www.somewhereinblog.net/

৫। http://bdtravelnews.com/

How do you feel about this story?
Fascinated
Informed
Happy
Sad
Angry
Amused