ধোঁকা, প্রতারণা ও মানুষ মারার শিল্প

Sirajam Munir Shraban

Contributor

মিলিটারি ট্যাকটিস তথা যুদ্ধের স্ট্রেটেজি নিয়ে বাংলায় লেখা বই পুস্তক খুব একটা দেখা যায় না। সম্প্রতি প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন সদস্য যুদ্ধবিদ্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের উপযোগী করে একটি বই লিখেছেন। নাম, “আধুনিক দৃষ্টিকোণে সান জু’র দ্য আর্ট অব ওয়ার”।

art-of-war

আজ থেকে চার হাজার বছরেরও আগে সান জু নামে চীন দেশে একজন সেনাপতি ছিলেন। সেনাপতি হিসেবে ছিলেন অবধারিতভাবে সফল। যুদ্ধের কলাকৌশলের উপর তার বিচক্ষণতা তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল। যুদ্ধ সম্পর্কে তার চিন্তাধারা ও উপলব্ধিগুলো একসময় তিনি লিপিবদ্ধ করে রাখার প্রয়াস নিলেন। ঐ সময়ে কাগজের প্রচলন তেমনভাবে শুরু হয়নি, তাই তিনি তার চিন্তাধারাগুলো বাঁশের চাটাইয়ে লিখে রাখলেন। শৈল্পিক মানে অনন্য হওয়াতে প্রাচীন এই বইটি সময়ের ঊর্ধ্বে চলে যায়। আজকে হাজার বছর পরেও তার সৌন্দর্যের কোনো কমতি নেই।

চিত্রঃ সাড়ে চার হাজার বছর আগে বাঁশের চাটাইয়ের উপর লেখা 'আর্ট অব ওয়্যার'।
চিত্রঃ সাড়ে চার হাজার বছর আগে বাঁশের চাটাইয়ের উপর লেখা ‘আর্ট অব ওয়্যার’।

এই বইটিকে কেন্দ্র করে বা এই বইটির ছায়া অবলম্বন করে মেজর মোঃ দেলোয়ার হোসেন লিখেছেন ‘আধুনিক দৃষ্টিকোণে সান জু’র আর্ট অব ওয়ার’। সান জু যখন তার বইটি লিখেছিলেন তখনকার যুদ্ধের অবস্থা আজকের যুদ্ধের অবস্থা থেকে একদমই ভিন্ন ছিল। আজকের যুগে এয়ার ডিফেন্স, ড্রোন, নিউক্লিয়ার অস্ত্রের বিপরীতে তখন ছিল হাতি, ঘোড়া, তলোয়ার আর তীর ধনুক। সেই হিসেবে সান জু’র লেখা বইটি আজকের যুগের অবস্থার সাথে বেমানান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অস্ত্র বা অবস্থান বা লোকবলের পরিবর্তন হলেও যুদ্ধ সবসময়ই যুদ্ধ। দুই পক্ষের মাঝে আজকে যে কৌশল কাজ করে চার হাজার বছর আগেও একই কৌশল কাজ করেছিল। তাই, যদি খুঁজে নেবার চোখ থাকে তাহলে দেখা যাবে আধুনিক যুগেও একটুও আবেদন কমেনি সান জু’র পুরাতন এই বইটির। আর খুঁজে নেবার এই কাজটিই করেছেন লেখক দেলোয়ার হোসেন। তিনি সানজুর চিন্তাধারাকে প্রয়োগ করেছেন যুদ্ধের আধুনিক ক্ষেত্রে। ফলে এটি হয়ে উঠেছে খুব সুখপাঠ্য একটি বই হিসেবে।

আর্ট অব ওয়্যার সম্বন্ধে তেমন কিছুই জানতাম না। বিখ্যাত বিজ্ঞানী ‘নিল ডিগ্রেস টাইসন’ একবার বলেছিল প্রত্যেক বুদ্ধিমান মানুষকেই মরার আগে আটটি বই পড়া উচিৎ। উনার মতো মানুষ কিছু একটা বললে না দেখে পারা যায়? তার উপর বই নিয়ে। ঐ তালিকার মাঝে ছিল সান জু’র লেখা বই আর্ট অব ওয়্যার। বইটা কেন পড়া উচিৎ তা একটি মাত্র বাক্যে বলেছেন তিনি- “To learn that the act of killing fellow humans can be raised to an art.” মানুষকে মারাও যে একটা আর্ট হতে পারে এমনকি উঁচু পর্যায়ের আর্ট হতে পারে তার অসাধারণ নমুনা দেখতে এই বই পড়া উচিৎ। এরপর থেকে সিদ্ধান্ত নেই বইটা পড়ব।

ঘাটাঘাটি করে জানতে পারি খ্রিস্টের জন্মের আড়াই হাজার বছর আগে চীনের সেনা নায়ক সান জু (Sun Tzu) চাটাইয়ের উপর এই বই লিখে গেছেন। একটা ইংরেজি নমনীয় সংস্করণও সংগ্রহ করলাম, কিন্তু খুব এলোমেলো লাগছিল তাই পড়তে পারছিলাম না। ২০১৫ সালের শুরুর দিকের কথা এটি। ঘটনাক্রমে বাতিঘর থেকে ২০১৫ এর বই মেলাতে এই বইয়ের ভাবকে কেন্দ্র করে আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে একটি বই বের হয়েছে। মনে হলো, যাক এবার একটা কাজের কাজ হলো। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদাহরণের মাধ্যমে বইটি লেখার ফলে বইটি আজকের যুগের প্রেক্ষাপটে আরো মূল্যবান হলো।

একটু দেরি করেই হাতে পেয়েছিলাম বইটি। লেখক সামরিক বাহিনীর লোক। যুদ্ধবিদ্যা সংক্রান্ত একটি বই লেখার জন্য সামরিক বাহিনীর একজন লোকের চেয়ে উপযুক্ত আর কী হতে পারে?

চিত্রঃ লেখক দেলোয়ার হোসেন। তিনি ব্লগে ‘ডি. এইচ. খান’ নামে লেখালেখি করেন।
চিত্রঃ লেখক দেলোয়ার হোসেন। তিনি ব্লগে ‘ডি. এইচ. খান’ নামে লেখালেখি করেন।

ধোঁকা, প্রতারণা, চাতুরী, বিশ্বাসঘাতকতা, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি যে একটা জাতির জন্য কতটা দরকার, এবং এগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যে কী দারুণ শিল্প তা অনুধাবন করতে হলে এই বইটা পড়তে হবে। আমার কথায় অবিশ্বাস হচ্ছে? মনে প্রশ্ন জাগছে ধোঁকা, প্রতারণা ইত্যাদি বাজে জিনিস কীভাবে একটি জাতির জন্য দরকারি হতে পারে?

একটি দেশ বা ভূখণ্ডের সাথে যেহেতু ঐ দেশের মানুষের জীবন ও মালামালের সম্পর্ক রয়েছে তাই মানুষের জান-মাল রক্ষার্থে যুদ্ধের বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। অন্য জাতির আক্রমণ থেকে নিজের জাতিকে বাঁচাতে হলে যুদ্ধ করতে হবে। শুধু যুদ্ধ করলেই হবে না, সেই যুদ্ধে সর্বনিম্ন ক্ষতির বিনিময়ে জয়লাভ করতে হবে। ঠিক এই জায়গাটিতেই চলে আসে “যুদ্ধের আর্ট” নামক জিনিসটি।

যুদ্ধে শুধু জিতে যাওয়ার হিসাব করলেই হয় না। কত কৌশলে নিজের কাছ থেকে সবচেয়ে কম গচ্চা দিয়ে যুদ্ধে জিতে আসা যায় সেটাই মূল লক্ষ্য। কারণ, লেখকের ভাষায়- যুদ্ধ কোনো দাবা খেলার মাঠ নয়। সমস্ত বেলা নিয়ে খেলে গেলাম, বেলা শেষে একটা সৈন্য অবশিষ্ট রেখে জিতে গেলেই হলো, এমন না। যেহেতু সৈন্যদেরকে অনেক দিন ধরে খাইয়ে পড়িয়ে, যুদ্ধবিদ্যা শিখিয়ে লালন পালন করা হয়েছে, এবং পরবর্তী যুদ্ধে তাদের ব্যবহার করতে হবে, তার উপর মানব সৈন্য অফুরন্ত নয় তাই তারা হড়কা বানের মতো মরে গেলেই হবে না। তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে এবং পাশাপাশি যুদ্ধে জয়লাভ করতে হবে। তখনই চলে আসে ধোঁকা, প্রতারণা, চাতুরী আর বিশ্বাসঘাতকতার খেলা। যে যত বেশি এই জিনিসগুলো আয়ত্ত করতে পারবে তার জয় তত নিশ্চিত।

যুদ্ধে আরো একটা দারুণ জিনিস হচ্ছে গণিতের ব্যবহার। এটা অবাক করার মতো হলেও সত্য যে একটি যুদ্ধের অনেক কিছুই গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। যুদ্ধের প্রধান গাণিতিক কৌশলের দিক থেকে যত অভিজ্ঞ হবে পরিবেশ ততই তার অনুকূলে থাকবে। তবে এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, গণিত মানে কিন্তু আমাদের প্রচলিত ‘অংক’ নয়।

গণিতের হাত ধরে আসে গেইম থিওরির ব্যাপারটা। যুদ্ধক্ষেত্রে এই গেইম থিওরি খুব দারুণ কাজে দেয়। গেইম থিওরি নামের হিটলারি বুদ্ধি যার মাথায় বেশি থাকবে সে ততো এগিয়ে থাকবে। গেইম থিওরি কী, এটা বলতে গেলে আজকে এক বেলা চলে যাবে। এতটুকুই বলা যায় এই থিওরির চমকপ্রদ একটা দিক নিয়ে কাজ করে গণিতবিদ ‘জন ন্যাশ’ অর্থনীতিতে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন।

সান জু’র আর্ট অব ওয়ার অবলম্বনে লেখা “আধুনিক দৃষ্টিকোণে সানজুর দ্য আর্ট অব ওয়ার” বইটা ফাটাফাটি হয়েছে। লেখক দেলোয়ার হোসেন খানকে অনেক ধন্যবাদ এমন একটা বই উপহার দেবার জন্য। সাড়ে চার হাজার বছর আগে লেখা বই, সাড়ে চার হাজার বছর আগেকার প্রেক্ষাপটকে পালটে আধুনিক প্রেক্ষাপটের মাধ্যমে লিখতে গিয়ে নিশ্চয়ই অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। পড়তে হয়েছে অনেক অনেক বই। পড়লে বোঝা যায় বইটিতে অনেক পরিশ্রম লুকিয়ে আছে। লেখককে আবারো ধন্যবাদ, এবং পরবর্তীতে আরো আরো ভালো ভালো মানের বই উপহার দেবার তাগাদা জানাচ্ছি। 

নামঃ আধুনিক দৃষ্টিকোণে সান জু’র আর্ট অব ওয়ার

লেখকঃ মেজর মোঃ দেলোয়ার হোসেন

প্রকাশকঃ বাতিঘর

প্রথম প্রকাশঃ ২০১৫

How do you feel about this story?
Fascinated
Informed
Happy
Sad
Angry
Amused