ইতিহাস

বাংলার অ্যানিমেশন যাত্রার ইতিহাস

Published

Search Icon Search Icon Search Icon Search Icon

Debraz Deb

Contributor

১৮৯০ সালে বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হলেও অ্যানিমেশনের যাত্রা অবিশ্বাস্যভাবে এর অনেক আগে, ১৬০০ সালের গোড়ার দিকে। মূলত অ্যানিমেশনের ধারণা পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ আগে। পটের মধ্যে মানুষের হাঁটার প্রতি পদক্ষেপের ছবি পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় সেখানে থেকেই এই অসাধারণ বিষয়টার যাত্রা শুরু। এছাড়া লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকাতেও এর ছায়া দেখা যায়। ১৯০৬ সালের আগে ম্যাজিক লানটার্ন , থাউমাট্রোপ, ফিনাকেটাস্কোপ, জয়ট্রোপ, ফ্লিপ বুক , প্রেক্সিনোস্কোপের মাধ্যমে অ্যানিমেশন দেখানো হত।

a1

ছবিঃ ফ্লিপ বুকের মাধ্যমে অ্যানিমেশন।

১৯০৬ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রথম স্টপ মোশনের মাধ্যমে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। নানা চড়াই-উতরাই পার করে চলতে থাকে এই যাত্রা। তবে ১৯২৮ সালে অ্যানিমেশনের সংজ্ঞাই বদলে দেয় ওয়ালট ডিজনি প্রোডাকশন। এই প্রথম অ্যানিমেশন জগতে শব্দের ব্যবহার হয়। এরপর আর পশ্চিমা বিশ্বে অ্যানিমেশন নিয়ে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

ছবিঃ ডিজনি’র প্রতিষ্ঠাতা ওয়াল্ট ডিজনি।

ছবিঃ ডিজনি’র প্রতিষ্ঠাতা ওয়াল্ট ডিজনি।

যখন পশ্চিমা বিশ্ব এই শিল্পকে নিয়ে মাতামাতি করছে আর আমাদের এই উপমহাদেশে এই ব্যাপার তখনও অনেক নতুন। যদি আমরা উপমহাদেশের অ্যানিমেশনের মূলে যাই তাহলে বলতে হবে ২০০০ বছর পূর্বেই এর ধারণা পাওয়া গিয়েছিল। বুদ্ধ বলেছিলেন, তার ভ্রমণের সময় তিনি “পটের গান” দেখেছেন। পটের গান গল্পবলার একটা শক্তিশালী মাধ্যম, যেটা এখনও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অনেক বেশি জনপ্রিয়। এছাড়া মহাভারত সহ বিভিন্ন সংস্কৃত সাহিত্যে ছায়ানাট্যের কথা উল্লেখ আছে। শিল্পায়নের আগ পর্যন্ত এটা বেশ জনপ্রিয় ছিল। ছায়ানাট্যের অনেক কৌশলই বর্তমানের আধুনিক অ্যানিমেশনে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, বিশেষ করে জয়েন্টের ভাঙ্গনগুলো।

১৯৩৪ সালে গুণময় ব্যানার্জী নামে এক বাংলাদেশী ব্যক্তি প্রথম অ্যানিমেশন তৈরি করেন। যেটার নাম ছিল “দ্য পি ব্রাদার্স” (সূত্রঃ জিন এন রাইট) । তবে আজ পর্যন্ত এর কোন কপি পাওয়া যায়নি। এবং এটা কোথায় সংরক্ষিত আছে তাও কেউ জানেন না। অন্যদিকে ১৯৬০ সালে এক বাঙ্গালী “মন্দার মল্লিক” মন্দার স্টুডিও নামে কলকাতায় এক অ্যানিমেশন স্টুডিও চালু করেন (সূত্রঃ মৃণাল ঘোষ) এবং কিছু অ্যানিমেশন বানানোর চেষ্টা করেন।

ছবিঃ মন্দার স্টুডিও এর অ্যানিমেশন (১৯৬০)।

ছবিঃ মন্দার স্টুডিও এর অ্যানিমেশন (১৯৬০)।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম অ্যানিমেশন দেখা যায় ১৯৮০ সালে। ন্যাশনাল টেলিভিশন প্রযোজনায় যেটা ছিল একটা টিভি বিজ্ঞাপন (নাম পাওয়া যায় নি )। এরপর একটা লম্বা বিরতির পর ১৯৯৭ সালে রিয়াজুল করিম ইউনোস্কোর এক প্রকল্পে টেলিভিশনের জন্য একটা এক মিনিটের বিজ্ঞাপন বানান। যা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর উপর ছিল।  ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে জনপ্রিয় টেলিভিশন কার্টুন মিনা চালু হলেও এটি মূলত মুম্বাইতে তৈরি হত। কিন্তু ১৯৯৭ সালের পরের পর্বগুলো বাংলাদেশীদের হাতেই তৈরী হয়।

ছবিঃ মীনা কার্টুন।

ছবিঃ মীনা কার্টুন।

এদিকে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম অ্যানিমেশন ওয়ার্কশপ হয়। যেখানে কীভাবে অ্যানিমেশন তৈরি হয় এবং এর টেকনিক্যাল দিক সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। এরপর অনেকেই ছোট আকারে অ্যানিমেশনের কাজ শুরু করে।

১৯৯৯ সালের দিকে একদল তরুণ উদ্যোগে অ্যানিমেশন স্টুডিও “ফিলোমেলা” গড়ে তোলে। তারা মূলত বাংলাদেশের লোক-সাহিত্য নিয়ে ছোট অ্যানিমেশন তৈরি করেন। কিন্তু আর্থিক দূর্বলতার কারণে তা আর আগাতে পারেনি।

একই বছর কামাল কাদের “গ্লোব কিডস” নামে একটা ওয়েব অ্যানিমেশনের যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু তিনিও টিকে থাকতে পারেননি।

২০০০ সালে বিডি লিমিটেড “গ্রিন ফিল্ড টুনস” নামে একটি অ্যানিমেশন স্টুডিও চালু করে। তারা বাংলাদেশের অ্যানিমেশনের অগ্রযাত্রায় বিশাল ভূমিকা রাখে। তারা এনিমেটরদের জন্য বিদেশের প্রশিক্ষক দিয়ে কর্মশালা করান। একমাত্র তারাই আন্তজার্তিক পর্যায়ে কাজ করে। এখান থেকেই দেশের শীর্ষ এনিমেটররা বের হয়।

এদিকে সফটএডজ প্রযোজিত অ্যানিমেশন কার্টুন “মন্টু মিয়ার অভিযান” বাংলাদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। যা এখন পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

ছবিঃ মন্টু মিয়ার অভিযান।

ছবিঃ মন্টু মিয়ার অভিযান।

ছবিঃ মন্টু মিয়ার অভিযান।

ছবিঃ মন্টু মিয়ার অভিযান।

২০০২ সালে ইউনাইটেড নেটওয়ার্ক নামে এক স্টুডিও চালু হয়। সেটিও এক বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। তবে সেই এক বছরে বেশ কিছু স্মরণীয় কাজ করে গেছে।

২০০৪ সালে “নয়ন-তারা” নামে একটি স্টুডিও হয়। মূলত ইউনাইটেড নেটোয়ার্কের কর্মীরাই এখানে যোগ দেন। তারা ২০০৯ সাল পর্যন্ত শিক্ষা বিষয়ক অ্যানিমেশন তৈরি করে।

২০০৫ সালে গ্রীনফিল্ড টুনসের একদল এনিমেটর “ফিলোটুনসে” যোগ দেন। পরবর্তীতে এই ফিলোটুনসের মালিকানা পরিবর্তন হয়ে টুনবাংলা নামে পরিচিত লাভ করে। টুনবাংলা বর্তমানে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান।

২০১১ সালে ড্রীমার ডানকি নামে একটি প্রাইভেট স্টুডিও চালু হয়। যা বর্তমানে অন্যতম প্রতিষ্ঠিত একটি স্টুডিও।

বাংলাদেশের থ্রী ডি অ্যানিমেশনের ইতিহাস ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে। কারিগরি ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সফটএডজ লিমিটেড “রবোটদের গ্রহে একদিন” নামে একটি থ্রী ডি অ্যানিমেশন তৈরি করে। যা উপমহাদেশে প্রথম থ্রী ডি অ্যানিমেশন ছিল।

“দ্যা ড্রীমস্টেজ” নামে বাংলাদেশে প্রথম ফিচার অ্যানিমেশন ফিল্ম হয়। এছাড়া ২০১৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম আন্তজার্তিক অ্যানিমেশন ফেস্টিভ্যাল হয়।

বর্তমান বিশ্বে অ্যানিমেশনের আর্থিক মূল্য ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (সূত্রঃ নাসকম রিপোর্ট)। বিশ্বে আমেরিকা, ইউরোপ এবং জাপান মূলত অ্যানিমেশনের আতুরঘর। এছাড়া ভারত, ব্রাজিল, ফিলিপাইন, চীন, মেক্সিকো এসকল দেশ এই তিন দেশের সাথে যৌথ প্রযোজনায় গিয়ে প্রচুর আয় করছে। প্রতি মিনিট অ্যানিমেশন তৈরি করে আয় করা সম্ভব ৫০০-১০০ মার্কিন ডলার। “টয় স্টোরি ৩” এর বাজেটই ছিলো ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেখানে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত শুধু অ্যানিমেশন হাতে আউটসোর্সিং করে দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে।

ছবিঃ টয় স্টোরি ৩ এর পোস্টার।

ছবিঃ টয় স্টোরি ৩ এর পোস্টার।

আর সেখানে বাংলাদেশের অ্যানিমেশনের বাজার এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে । তবে এটি অনেক সম্ভাবনাময় খাত। বর্তমানে প্রায় ১২০০০ এনিমেটর এই খাতে কাজ করেছেন।  বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের এবং এনিমেটরদের অবস্থা বিবেচনায় হিসেব করা হয় এই খাত উঠে আসলে দেশের জিডিপিতে ৬% অবদান রাখতে পারবে (সূত্রঃ গবেষণা রিপোর্ট-প্রথম আলো)। আমাদের দেশে অ্যানিমেশন খাত দাড়াতেই পারছে না শুধুমাত্র পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এবং মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে। গবেষকদের মতে যখনই এই ব্যাপারগুলো দূর হবে তখনই এই খাতের উন্নতি নজরে আসবে। বর্তমানে এ খাতে কিছু উদ্যমী তরুণ দরকার। যারা দেশের অ্যানিমেশনকে শিল্প খাতে পরিণত করবে। কে জানে আপনিও হতে পারেন একজন দক্ষ এনিমেটর। আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহতেও একদিন কুম্ফু পান্ডা বা আইস এইজের মত দেশী চলচ্চিত্র আমরা দেখবো সে আশাতেই আছি।

তথ্যসূত্রঃ

1:  History Of Animation – Resize Window
2: Al Jazeera  News Channel
3: Meena is for all – UNICEF
4: Rana Moshiur, Owner of Dreamer Donkey (animation studio)

এই লেখা নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?

Fascinated
Informed
Happy
Sad
Angry
Amused

মন্তব্যসমূহ